তৃণমূলের ভুল তথ্যে বিব্রত আ.লীগ

রবিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২১

পদে না থেকেও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দলীয় পদবি ব্যবহার, জেলা-উপজেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করা, বঞ্চিত হয়ে নৌকা প্রতীকপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে ভিত্তিহীন অভিযোগ দাখিল, রেজ্যুলেশনে একক নাম পাঠানোসহ কেন্দ্রে নানামুখী ভুল তথ্য উপস্থাপন করায় বিব্রত আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।

তারা বলছেন, কেন্দ্রে আসা অধিকাংশ অভিযোগ ভিত্তিহীন। বাস্তবে তার কোনো সত্যতা নেই। একই সাথে দলীয় পদে না থেকেও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সময় পদ-পদবি ব্যবহার খুবই দুঃখজনক। যারা তথ্য গোপন করে বিতর্কিতদের নাম কেন্দ্রে পাঠাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে দাবি করছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।

আ.লীগ সূত্র জানায়, তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল শনিবার থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। এর আগে দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৮টি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করে দলটি। ছয় দিনে প্রায় ৫০ ঘণ্টা বৈঠকে দলের মনোনয়ন বোর্ড সভায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে ক্ষমতাসীনরা। চূড়ান্ত করা দ্বিতীয় ধাপের প্রার্থীদের নাম ঘোষণার পরপরই কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেন বঞ্চিতরা।

তারা বলেন, বিএনপি-জামায়াত ও শিবিরের নেতা, স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী পরিবারের সদস্য, সাম্প্রদায়িক হামলার সঙ্গে জড়িত, খুন ও নারী নির্যাতন মামলার আসামি, প্রধানমন্ত্রীর ঘর প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎকারী, বিধবা ও বয়স্ক ভাতার কার্ড নিয়ে প্রতারণা, গরিবের চাল বিক্রিসহ নানামুখী অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, দখলবাজদের নৌকার মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। বিতর্কিত এসব প্রার্থীর মনোনয়ন পাইয়ে দিতে সরাসরি যুক্ত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা-উপজেলার প্রভাবশালী নেতারা বলে অভিযোগ তাদের।

চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিতর্কিত শতাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে এসব অভিযোগ জমা পড়ে। যদিও আওয়ামী লীগের দাবি, তৃণমূল থেকে ৪০টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ওই সকল অভিযোগ বেশ গুরুত্বের সাথেই দেখেছেন তারা। প্রতিটি অভিযোগ সঠিক যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে ১৩ জন প্রার্থী পরিবর্তনও করেছে দলটি।

দলটির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকার মনোনয়ন ফরম তুলেছিলেন প্রায় ১০ জন করে। এর মধ্যে আবার অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে দলের পদে না থেকেও দলীয় পদবি ব্যবহার, জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করা, বঞ্চিত হয়ে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ দেয়া, সঠিক তথ্য গোপন করে তৃণমূলের রেজ্যুলেশনে একক নাম পাঠানো ইত্যাদি। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ দলটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, দ্বিতীয় ধাপে নৌকার মনোনয়ন সংগ্রহের সময় অনেকেই ভুল তথ্য দিয়েছেন। কেউ কেউ দলের পদে না থেকেও দলীয় পদবি ব্যবহার করছেন। অনেকেই জেলা-উপজেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষর জাল করে মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। বাস্তবে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। যেখানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে সেখানে ইতোমধ্যেই প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে।

জানা যায়, দ্বিতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চূড়ান্ত করা আওয়ামী লীগের শতাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানামুখী বিতর্কের অভিযোগ জমা পড়ে কেন্দ্রে। যে সকল প্রার্থীর বিরুদ্ধে তৃণমূল থেকে অভিযোগ কেন্দ্রে এসেছে সেই সকল প্রার্থীর অভিযোগগুলো বেশ গুরুত্বের সাথেই দেখছেন ক্ষমতাসীন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।

তারা প্রতিটি অভিযোগ ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও বিশ্বস্ত সূত্র থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে সর্বশেষ গত শুক্রবার পর্যন্ত মোট ১৩ জন বিতর্কিত প্রার্থীকে পরির্বতনও করেছে আওয়ামী লীগ।

এছাড়া কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জেলা-উপজেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা তৃণমূল থেকে পাঠানো রেজ্যুলেশনে একক নামের তালিকাও পাঠিয়েছিলেন। তা নিয়েও দলের অভ্যন্তরে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অথচ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও দলটির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত ছিলো সর্বনিম্ন তিন জনের নাম রেজ্যুলেশনে পাঠাতে হবে।

তারপরও কোথাও কোথাও নাম পাঠানোর ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি করেছেন স্থানীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ উপজেলা পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতারা। কিছু কিছু জায়গায় পাঠানো হয়েছে একজনের নাম। যদিও যেসব জেলা-উপজেলার নেতারা বিতর্কিত প্রার্থীদের পরিচয় গোপন করে মনোনয়ন বোর্ডে তালিকা পাঠিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন দলটির মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো কোনো জেলা থেকে তথ্য গোপন করে যারা বিতর্কিতদের নাম কেন্দ্রে পাঠাচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে অভিযোগের পাহাড় বা স্তূপ জমা হয়ে আছে— অথবা দফায় দফায় প্রার্থী পরিবর্তন করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ মোটেই সত্য নয়। প্রায় ৪০টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার ভিত্তিতে ১৫টি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় প্রার্থী পরিবর্তন করা হয়েছে। অভিযোগ করলেই যে সব সত্য এমনটাও মনে করার কিছু নেই। বর্তমানে যারা দলে বা নির্বাচনে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাদের হারানোর কিছু নেই।’

ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে শেখ হাসিনা তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করবেন জানিয়ে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যতক্ষণ নেতৃত্বে আছেন ততক্ষণ কারো শ্রম ও ত্যাগ বৃথা যাবে না। সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে। নির্বাচিত চেয়ারম্যানকে নিজের পক্ষে রাখতে গিয়ে বিতর্কিতদের নাম কেন্দ্রে না পাঠাতে আবারো স্মরণ করিয়ে দেন ওবায়দুল কাদের।