একজন মানবিক ডাক্তার’র গল্প ও কিছু কথা

শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১

মিলন কান্তি দাস, নলছিটি, ঝালকাঠি

ডাক্তারের কথা শুনলেই আস্থার প্রতীক বলে একটা মানবিক মুখ ভেসে ওঠে হৃদয় পটে। আবার কখনও কখনও নানান ধরনের টেস্ট আর প্রয়োজন ছাড়া একগাদা ওষুধ ধরিয়ে দেয়া ব্যাবসায়ী ডাক্তারের অর্থ কামানো কুৎসিত মুখ গুলোও ভেসে ওঠে। অসংখ্য মানবিক হৃদয়বান ডাক্তাররা এইসব ব্যবসায়ী ডাক্তারের কাছে হেরে যান। যদিও এসব ডাক্তারদের পাশাপাশি যেসব ডাক্তার বন্ধুরা গরিব রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা সহ তাদের কাছে থাকা স্যাম্পল গুলো দিয়ে সহযোগিতার হাত যখন প্রসারিত করেন তখন তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় নত হয়ে যাই। যখন কোন গরীব অসহায় রোগী এসে বলেন স্যার ওমুক ডাক্তার সাহেব খুব যত্ন করে দেখেছেন, ফ্রি ওষুধ দিয়েছেন, আবার সমস্যা হলে ফোন করে জানাতে বলেছেন। তখন আপনা থেকেই তার বা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জাগ্রত হয় হৃদয়ের গভীরে। পাশাপাশি যখন শুনি কেউ কেউ এইসব অসহায় মানুষদের সাথে রূঢ় আচরণ করেছেন তখন মনের কোনে একটা কেমন যেন ব্যথা অনুভব করি। একজন মানবিক ডাক্তার’র কোন বংশ পরিচয় বা আভিজাত্য থাকতে পারে না বলেই আমি মনে করি।
এতক্ষণ এতো কথা বলে ফেললাম মনের কষ্টে। কেউ যদি আমার উপরের লেখাতে কষ্ট পেয়ে থাকেন তবে ক্ষমা করবেন।
যে জন্য এই লেখা সেই মানবিক ডাক্তার’র গল্প বলছি আরে না গল্প নয় একদমই সত্যি ঘটনা।
২০১৫ সালে আমি অসুস্থ হয় ভারতে চিকিৎসার জন্য গেলে সেখানে পরিচয় হয় ডাক্তার শুভংকর চক্রবর্তীর সাথে। টিপটপ গোছানো স্বভাবের রুচি সম্পপন্ন একজন অতি আন্তরিক মানুষ তিনি। প্রথম পরিচয় থেকেই তার সাথে আন্তরিক মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়। আমরা যুক্ত হই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে। কোলকাতায় গেলেই তার সাথে দেখা হতো। আমাদের এক আত্মীয়ের বাসার নীচের তলায় তার চেম্বার ও ফিজিও থেরাপি সেন্টার ছিলো। কয়েক বছর পর সেখান থেকে তার চেম্বার সরিয়ে নিলেও ফেইসবুক’র বদৌলতে আমাদের যোগাযোগ ছিলো। তিনি তার উপার্জনের একটা বড়ো অংশ আর্ত-মানবতার সেবায় খরচ করে যাচ্ছিলেন। প্রতিনিয়ত তার এইসব মানবিক কাজগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দেখে দেখে তার প্রতি ভালবাসা আরো গভীর হচ্ছিল। যেখানে মানুষ অর্থ উপার্জন করে বিলাসবহুল বাড়ি,দামী গাড়ি আর অন্যান্য বিনোদনের পেছনে খরচ করে সেখানে তার মানবিকতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। তিনি খুঁজে ফেরেন কোথায় কে কষ্টের মধ্যে আছে। অর্থের অভাবে কে চিকিৎসা করাতে পারছে না বা পড়াশোনার খরচ জোটাতে পারছে না। এমনি সামাজিক মানবিক কাজে তিনি নিজেকে যুক্ত করে আনন্দের সাথে সময় কাটান। ফেইসবুকে তার এই কাজ গুলো দেখি এবং প্রায়ই কথা হয় অনলাইনে। তাকে কথা দেই কোলকাতা গেলে দেখা করবো তার সাথে। পরে কোলকাতায় গেলে নিজের একটা সমস্যা কথা শেয়ার করি তার সাথে। তিনি আমার ফোন পেয়েই বলেন আগে বলেন কখন আসছেন আমার কাছে? তার আন্তরিক মধুর আহ্বানে পরদিন চলে যাই তার চেম্বার ও বাড়িতে। কোলকাতা এয়ারপোর্টের খুব কাছেই কোলকাতার বিখ্যাত ক্যাফেকফির পেছনেই তার বাড়ি। বাড়ির কাজ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। পরে বেশ কিছুক্ষণ ক্যাফেকফিতে চললো গল্প। ফেইসবুকে দেখা বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন একজন মানুষের জীবন চালাতে কতো টাকা দরকার বলুন? আমার উপার্জিত টাকা থেকে কিছুটা দরিদ্র অসহায়দের পেছনে খরচ করলে ক্ষতি কি। তার ইচ্ছে সকল বাঙালির জন্য একটা কিছু করতে। হোক সে ইন্ডিয়ার কিংবা বাংলাদেশের। তার কথা গুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। কতোটা হৃদয়বান হলে এমন চিন্তা জাগ্রত হতে পারে ভেবে দেখুন। তার কাছে জানতে চাইলাম আপনার আগামী দিনে আর কি কি পরিকল্পনা আছে? এই প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছিলেন তা তুলে ধরছি বন্ধুদের জন্য।
ডাক্তার শুভংকর চক্রবর্তীর বয়ানেই পড়ে দেখুন। আমি আমার পেশেন্টেদের শুধু রোগ সারিয়ে তুলি না, তাদের মানসিকভাবে শক্ত করে তুলতে চেষ্টা করি। আমি প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসে একজন করে মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়ে থাকি। এখনো পর্যন্ত ১৯ জন অসহায় দরিদ্র শিক্ষার্থীদের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেছি। যারা ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকে কাজ দেবার চেষ্টা করি। পাগল হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানুষ পেলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। যে সব মানুষের ওষুধ,পথ্য কেনার ক্ষমতা নেই তাদের জন্য ওষুধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করি। ২০১৯ সাল থেকে কিছু দুঃস্থ মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এইসব ছাড়াও আমার জীবন একটা বিশাল স্বপ্ন আছে আর তা হলো একটা বৃহৎ নিঃশুল্ক হসপিটাল করা। যে হসপিটালে একসঙ্গে এক লক্ষ মানুষের চিকিৎসা হবে। আর টাকা পয়সা না থাকলেও কেউ বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বরণ করবে না। আর আমার সেই স্বপ্নের সংগঠনের নাম হবে “LOVE Largest Organisation in Valuable Earth”।
তার কথা গুলো শুনছিলাম আর ভাবছিলাম এমন ডাক্তার খুব বেশি দরকার নেই। আমার প্রিয় জন্মভূমিতে খুব বেশি দরকার নেই অল্প কিছু এমন মানবিক ডাক্তার একত্রিত হলে কোন দরিদ্র অসহায় মানুষ আর বিনা চিকিৎসা বা বিনা ওষুধে অন্তত মৃত্যু বরণ করবে না। সেইসব মানবিক ডাক্তার’র দল বলতে পারবে আমরা পেরেছি আমাদের শপথ রাখতে। আমি স্বপ্নে হারিয়ে যাই। ঘোরের মধ্যেই দেখতে থাকি এমন অনেক মানবিক ডাক্তার এক হয়েছে যারা তাদের উপার্জনের একটা অংশ দরিদ্র অসহায়দের চিকিৎসার পেছনে খরচ করছেন।
আমি নিশ্চিত আমার দেশেও শুভংকর চক্রবর্তীর মতো অসংখ্য ডাক্তার আছেন তারাও নিরবে নিভৃতে গরীব অসহায় মানুষদের পাশে থেকে সেবা করে যাচ্ছেন।
শ্রদ্ধেয় মানবিক ডাক্তার বন্ধুরা অন্য পেশার সাথে আপনাদের পেশাকে মেলাবেন না দয়া করে। কারন একমাত্র আপনারাই পারেন রোগের সাথে যুদ্ধ করে একজন মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর জীবন রক্ষা করতে। আপনাদের তুলনা আপনারাই। একটা সিনেমায় দেখা ঘটনার বর্ননা করেই শেষ করবো লেখাটা।
একটা অপারেশন থিয়েটারে রোগীর অপারেশন চলছে। ডাক্তারদের ছোটাছুটি, নার্সদের যন্ত্রপাতি এগিয়ে দেয়া। ডাক্তারদের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে রোগী এক পর্যায়ে মৃত্যু বরণ করে। এতক্ষণ ধরে যারা চেষ্টা করছিলো বোগীকে বাচাঁনোর তারাই আস্তে আস্তে অপারেশন টেবিলের পাশ থেকে বিদায় নিলো। ডাক্তার, নার্স যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু যে সার্জন এই টিমের প্রধান ছিলেন তিনি রোগীর মৃত দেহের দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন। পাশে জুনিয়র ডাক্তারদের দল হাসি ঠাট্টা আর গল্পে মেতে আছেন। হঠাৎই সার্জন তাদেরকে ডেকে বললেন এইমাত্র এই মানুষটি মৃত্যু বরণ করলো আর তোমরা হাসছো? তখন জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্য থেকে একজন বললো স্যার ওটিতে এমন মৃত্যু আমরা তো হামেশাই দেখি। সার্জন গম্ভীর গলায় বললো তোমরা কি পরাজিত যোদ্ধাদের কখনও হাসতে দেখেছো? পরাজিত মানুষ কখনও কি হাসতে পারে? সকল ডাক্তার নিশ্চুপ দাড়িয়ে আছেন কারো মুখে কোন কথা নেই। আর তিনি বলেই চলছেন এইমাত্র রোগ নামক শত্রুটি ডাক্তারদের পরাজিত করলো আর আমরা ডাক্তাররা হেরে গেলাম। তখন সারা ওটি জুড়ে পিনপতন নিরবতা। সবার চোখ থেকেই অঝোড় ধারায় অশ্রু ঝড়ছে। একজন চিৎকার করে বলে উঠলো স্যার আমরা আপনাকে কথা দিচ্ছি এরপর থেকে আমরা রোগকে পরাজিত করবো আর রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য সবটুকু করবো। সেই সার্জনকে ঘিরে ডাক্তার বন্ধুদের করা প্রতিজ্ঞার মতো আমরাও কি পারি না অর্থ উপার্জন করার পাশাপাশি মানুষের সেবায় নিজেদের সামিল করতে।

পরিশেষে বলবো ডাক্তার শুভংকর চক্রবর্তীর স্বপ্ন সফল হোক আর তার মানবিক কাজ অব্যাহত থাকুক আমৃত্যু।