চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিচারপতি ছানার নামে সড়কের নামকরণ দাবি, রাজশাহীতে ভার্চুয়ালে গুণীজনদের আলোচনা বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী

শনিবার, জানুয়ারি ১, ২০২২

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে সুপ্রিমকোর্টের আপীল বিভাগের বিচারপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও রাজশাহী প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী বিস্তারিত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করছে বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা স্মৃতি পরিষদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বেলা ১১ টায় শহরের খালঘাট গোরস্থানে কবর জিয়ারত ও আলোচনা সভা এবং রাজশাহী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বিকেল সাড়ে ৪টায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মসূচি থেকে শহরের কোন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার নামে নামকরণের জোর দাবি উঠেছে।

বিকেলে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচনা সভায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার ত্যাগ পদের প্রতি কমিটমেন্ট রূপকথার মতো। সূর্যসেন হলের ২৩৮ নম্বর কক্ষে থাকাকালে তাঁকে দেখেছি নিজের পকেটে পয়সা নেই, তবুও কর্মীদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। নিজে না খেয়ে থেকেছেন এমন দিনও গেছে। কিন্তু কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলতেন না। তাঁর বিচারিক জীবনে কোন দলীয় প্রভাব ছিল না। তিনি তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন। তাঁকে এমন বলতে শুনেছি, ‘আমি বিচারক হয়ে রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি, আর আপনারা বিচারক হয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন।’
ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এএইচএম হাবিবুর রহমান ভুঁইয়া (জিন্না) তাঁর বিচারক জীবনে আসার পেছনে বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার অবদানের কথা স্মৃতিচারণ করেন। এছাড়া পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোঃ মেহেদী হাসান তালুকদার স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা রাখেন।

রাজশাহীতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচনা সভা: রাজশাহীতে বিকেল সাড়ে ৪টায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে আলোচনা সভায় হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এএইচএম হাবিবুর রহমান ভুঁইয়া (জিন্না), পঞ্চগড় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মোঃ মেহেদী হাসান তালুকদার, বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস জাহাঙ্গীর কবির রানা, স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাসিবুল আলম প্রধান, রাজশাহী প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য আহমদ সফিউদ্দির অংশগ্রহণ করেন। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মো. আসলাম-উদ-দৌলা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে কবর জিয়ারত ও আলোচনা সভা :
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কবর জিয়ারত শেষে আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ৯৮’ সালের দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে মানুষ লাশ দাফনের জায়গা পাচ্ছিলো না। সেসময় ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল পদে থাকা বজলার রহমান ছানা তৎকালীন পানিমন্ত্রী কাছ থেকে এক প্রকার জোরজবরদস্তি করে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে দেন। যার সুফল চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ পাচ্ছে। দায়িত্বের প্রশ্নে যেমন শতভাগ ছিলেন, নীতির প্রশ্নেও ছিলেন আপোষহীন। তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জকে রক্ষার করার জন্য তাঁর ভূমিকার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে শহরের কোন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নাম বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার নামে নামকরণের জোর দাবি জানানো হয়।

এ সময় বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মো. আসলাম-উদ-দৌলার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. হাবিবুর রহমান।

সম্মানিত অতিথি হিসেবে আলোচনা রাখেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. গোলাম রাব্বানী, বিচারপতি বজলুর রহমান ছানার ভগ্নিপতি অধ্যাপক আলী আশরাফ আজীজী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফাইজার রহমান কনক, সিনিয়র সাংবাদিক ইমরান ফারুক মাসুমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

বজলুর রহমান ছানা’১৯৫৫ সালের ১২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের গোয়ালপাড়া মহল্লার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭০ সালে নবাবগঞ্জ হরিমোহন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি এবং ১৯৭২ সালে নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন। মেধাবী ছাত্র বজলুর রহমান ছানা ১৯৭৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ থেকে জুরিসপ্রুডেন্স বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) এবং ১৯৭৭ সালে একই বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৮২ সালে সমাজ বিজ্ঞানে বিভাগ থেকেও তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। তৎকালীন বৃহত্তর রাজশাহী তথা উত্তরবঙ্গের অন্যতম সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা ‘বজলুর রহমান ছানা’ ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তৎকালীন নবাবগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগ ও আশির দশকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাকসু নির্বাচনে ভি.পি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া রাজশাহী প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসনামলে ১৯৭৮ ও ১৯৭৯-৮০ সালে বিবর্তনমূলক আটকাদেশে কারাবরণ করেন। ১৯৮৩ সালের বিশেষ সামরিক শাসনামলে সামরিক আদালতে তিনি যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত হন যদিও পরবর্তীতে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।
তিনি ১৯৮৫ সাল থেকে প্রায় ১৫ বছর ঢাকার ধানমন্ডি ল’কলেজে আইনের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৪ সালে ঢাকার জজ কোর্ট এবং ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোটে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালে সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৯৯৯ সালে ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্টে তিনি প্রচুর সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে তিনি মৃত্যু অবধি দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারী তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে পরিবারের পক্ষ থেকে দোয়া চাওয়া হয়েছে।